August 10, 2026, 12:04 am

জাতীয় জীবনের সর্বক্ষেত্রে নজরুলের অপ্রতিরোধ্য উপস্থিতি অনস্বীকার্য
দৈনিক কুষ্টিয়া অনলাইন/
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের অসামান্য সাহিত্যকর্ম, মানবতাবাদী দর্শন, সাম্য ও অসাম্প্রদায়িক চেতনা এবং অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে তাঁর দুর্বার প্রতিবাদী ভূমিকা নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার প্রত্যয়ে কুষ্টিয়া সরকারি কলেজে যথাযোগ্য মর্যাদা ও উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে ‘নজরুল বর্ষ ২০২৬–২০২৭’ উদ্যাপন করা হয়েছে।
রোববার (৯ আগস্ট) সকাল ১১টায় কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ অডিটোরিয়ামে জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে বর্ণাঢ্য এ আয়োজনের সূচনা হয়। আয়োজনকে কেন্দ্র করে কলেজ প্রাঙ্গণে শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও আমন্ত্রিত অতিথিদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা যায়।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন কুষ্টিয়া সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর ড. মোহাঃ আব্দুল লতিফ। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন নজরুল বর্ষ উদ্যাপন পরিষদের আহ্বায়ক সিরাজুল ইসলাম।
নজরুলের আদর্শ জাতীয় জীবনের অনুপ্রেরণার উৎস/
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন কুষ্টিয়া জেলা বিএনপির আহ্বায়ক মোঃ কুতুবউদ্দিন আহমেদ। বক্তব্যে তিনি কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্য ও জীবনদর্শনের বহুমাত্রিক গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, জাতীয় কবি ছিলেন অন্যায়, অবিচার, শোষণ ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে এক অসামান্য প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর। তাঁর কবিতা ও সাহিত্যকর্ম বাঙালির আত্মমর্যাদা, স্বাধীনচেতা মনন এবং মানবিক মূল্যবোধকে জাগ্রত করেছে।
তিনি বলেন, “জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন অন্যায়, অবিচার ও শোষণের বিরুদ্ধে এক সোচ্চার কণ্ঠস্বর। দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক যেকোনো সংকটে তাঁর লেখা ও দর্শন আমাদের পথ দেখায়।”
প্রধান অতিথি আরও বলেন, নজরুল কেবল একজন কবি নন; তিনি বাঙালির চেতনা, আত্মমর্যাদা ও মুক্তির আকাঙ্ক্ষার এক শক্তিশালী প্রতীক। তাঁর সাহিত্যকর্মে একই সঙ্গে দ্রোহ, প্রেম, মানবতা, সাম্য ও সৌন্দর্যের যে অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছে, তা বাংলা সাহিত্যে তাঁকে অনন্য উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত করেছে।
তরুণ প্রজন্মের কাছে নজরুলের সাম্য ও মানবতার বার্তা পৌঁছে দেওয়ার আহ্বান
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে কুষ্টিয়া জেলা বিএনপির সদস্য সচিব ইঞ্জিনিয়ার জাকির হোসেন সরকার বলেন, নজরুলের সাহিত্য শুধু পাঠের বিষয় নয়; তাঁর দর্শন ও আদর্শ সমাজ ও রাষ্ট্রজীবনে ইতিবাচক পরিবর্তনের অনুপ্রেরণা জোগায়।
তিনি বলেন, “তরুণ প্রজন্মের মাঝে জাতীয় কবির সাম্য ও বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার চেতনা ছড়িয়ে দেওয়া আজ সময়ের দাবি। এই আয়োজন কুষ্টিয়া সরকারি কলেজের শিক্ষার্থীদের মাঝে নতুন প্রেরণা জোগাবে।”
তিনি আরও বলেন, নজরুলের মানবতাবাদী চিন্তা, অসাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি এবং শোষণ-বৈষম্যের বিরুদ্ধে তাঁর দৃঢ় অবস্থান বর্তমান প্রজন্মের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নজরুলচর্চা বাড়ানোর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মধ্যে মুক্তচিন্তা, সৃজনশীলতা ও মানবিক মূল্যবোধ আরও সুদৃঢ় করা সম্ভব।
বাংলা সাহিত্যে নজরুলের অবদান অনন্য
আলোচনা সভায় মুখ্য আলোচক হিসেবে বক্তব্য রাখেন চুয়াডাঙ্গা সরকারি কলেজের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মুন্সী আবু সাঈফ। তিনি জাতীয় কবির জীবন, সাহিত্যকর্ম, দর্শন ও বাংলা সাহিত্যে তাঁর অনন্য অবদান নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন।
তিনি বলেন, কাজী নজরুল ইসলাম বাংলা সাহিত্যে এক যুগান্তকারী প্রতিভার নাম। কবিতা, গান, গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ ও সাংবাদিকতার প্রতিটি ক্ষেত্রে তিনি তাঁর স্বতন্ত্র প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। তাঁর সাহিত্য একদিকে যেমন শোষিত ও নিপীড়িত মানুষের অধিকারের কথা বলে, অন্যদিকে প্রেম, সৌন্দর্য, সাম্য, মানবতা ও অসাম্প্রদায়িকতার এক মহৎ বার্তা বহন করে।
নজরুলের কবিতার দ্রোহী চেতনা বাঙালির আত্মপরিচয় ও আত্মমর্যাদাবোধকে জাগ্রত করেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, তাঁর সাহিত্যকর্ম কেবল একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নয়; বরং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে মানুষের অধিকার, স্বাধীনতা ও মানবিক মর্যাদার পক্ষে কথা বলার শক্তি জোগায়।
বিশেষ আলোচক হিসেবে বক্তব্য রাখেন কুষ্টিয়া সরকারি কলেজের অধ্যাপক মোঃ নাজমুল হোসেন। তিনি নজরুলের সাহিত্য ও দর্শনের বিভিন্ন দিক বিশ্লেষণ করে বলেন, জাতীয় জীবনে নজরুলের প্রভাব বহুমাত্রিক। তাঁর সৃষ্টিতে একই সঙ্গে প্রতিবাদের আগুন ও ভালোবাসার কোমলতা বিদ্যমান—যা তাঁকে বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য ও কালজয়ী ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে।
নজরুলচর্চা নতুন প্রজন্মকে আলোকিত করবে
সভাপতির বক্তব্যে কুষ্টিয়া সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর ড. মোহাঃ আব্দুল লতিফ বলেন, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বাঙালির সাম্য, দ্রোহ, প্রেম ও মানবিক চেতনার অন্যতম প্রধান অনুপ্রেরণা। তাঁর সাহিত্য ও জীবনদর্শন তরুণ প্রজন্মের চিন্তা ও মননকে সমৃদ্ধ করতে পারে।
তিনি বলেন, “জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম আমাদের সাম্য, দ্রোহ ও প্রেমের মূল প্রেরণা। নতুন প্রজন্মের কাছে নজরুলের আদর্শ পৌঁছে দেওয়া আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।”
তিনি আরও বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত নজরুলচর্চার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের শুধু সাহিত্যবোধই নয়, বরং মানবিকতা, অসাম্প্রদায়িকতা, দেশপ্রেম, ন্যায়বোধ ও দায়িত্বশীল নাগরিক হওয়ার মানসিকতাও গড়ে তোলা সম্ভব। নজরুলের জীবন ও সাহিত্য নতুন প্রজন্মকে সত্য, ন্যায় ও মানবিকতার পথে এগিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করবে।
সাংস্কৃতিক পরিবেশনায় মুখর অডিটোরিয়াম
আলোচনা সভার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হয় মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীরা জাতীয় কবির নির্বাচিত কবিতা আবৃত্তি, নজরুলসংগীত পরিবেশন এবং নৃত্য পরিবেশন করে।
কবিতা আবৃত্তিতে নজরুলের দ্রোহী চেতনা, গান পরিবেশনে তাঁর প্রেম ও মানবতার দর্শন এবং নৃত্যে তাঁর সৃষ্টির সৌন্দর্য ও ছন্দময়তা ফুটে ওঠে। শিক্ষার্থীদের প্রাণবন্ত পরিবেশনায় কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ অডিটোরিয়াম হয়ে ওঠে আনন্দ, আবেগ ও সৃজনশীলতার এক মিলনমেলা।
আয়োজনের প্রতিটি পর্বেই ফুটে ওঠে নজরুলের বহুমাত্রিক সৃষ্টিশীলতার অনন্যতা। তাঁর কবিতার বিদ্রোহ, গানের প্রেম, সাহিত্যের মানবতাবোধ এবং সাম্যের দর্শন যেন পুরো আয়োজনজুড়ে নতুন করে প্রাণ ফিরে পায়।
নজরুলের চেতনায় এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয়
আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে কুষ্টিয়া সরকারি কলেজের ‘নজরুল বর্ষ ২০২৬–২০২৭’ উদ্যাপন নতুন প্রজন্মের কাছে জাতীয় কবির জীবন, কর্ম ও আদর্শকে আরও গভীরভাবে তুলে ধরার একটি তাৎপর্যপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে প্রতিভাত হয়।
বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির ইতিহাসে কাজী নজরুল ইসলামের অবদান যেমন অনস্বীকার্য, তেমনি জাতীয় জীবনে তাঁর সাম্য, মানবতা, অসাম্প্রদায়িকতা, দেশপ্রেম ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থানও আজ সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সমাজ ও রাষ্ট্রের নানা বাস্তবতা বদলালেও মানুষের অধিকার, মর্যাদা ও মুক্তির যে আকাঙ্ক্ষা নজরুল তাঁর সৃষ্টিতে ধারণ করেছিলেন, তা আজও সমানভাবে প্রেরণাদায়ী।
নজরুল তাই কেবল অতীতের কোনো অধ্যায়ের কবি নন—তিনি বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের চিন্তা, চেতনা ও সৃজনশীলতারও এক অবিচ্ছেদ্য অনুপ্রেরণার নাম। কুষ্টিয়া সরকারি কলেজের এই আয়োজন সেই চিরন্তন নজরুলচেতনারই এক প্রাণবন্ত ও তাৎপর্যপূর্ণ প্রকাশ।